মুখোশের আড়ালে
-মাধুরী ব্যানার্জী
শহরের ব্যস্ততম মোড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেখা যেত এক ভদ্রলোককে। পরনে দামি পোশাক, চোখে কালো চশমা, মুখে সবসময় মিষ্টি হাসি। নাম তাঁর অরিন্দম সেন। শহরের সবাই তাঁকে চিনত—দানশীল, ভদ্র, সমাজসেবী মানুষ হিসেবে।
কেউ অসুস্থ হলে সাহায্য করতেন, দরিদ্র ছাত্রদের বই দিতেন, শীতের রাতে কম্বল বিলাতেন। তাঁর প্রশংসায় পত্রিকার পাতাও ভরে উঠত।
কিন্তু অরিন্দমের বাড়িতে কাজ করত রতন নামের এক কিশোর। ছেলেটি সবসময় চুপচাপ থাকত। একদিন ভুল করে একটি দামি ফুলদানি ভেঙে ফেলতেই অরিন্দমের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।
—“এত বড় ক্ষতি করেছিস! জানিস এর দাম কত?”
রতন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “দাদা, ভুল হয়ে গেছে। আমার মাইনে থেকে কেটে নেবেন।”
অরিন্দম কঠিন গলায় বললেন, “তোর মতো লোকের জন্যই বাড়ির সর্বনাশ হয়।”
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলেন অরিন্দমের বৃদ্ধ মা। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মানুষের সামনে যে মুখটা দেখাস, আর ঘরের ভিতর যে মানুষটা হয়ে উঠিস—দুটো কি একই?”
অরিন্দম চুপ করে গেলেন।
কয়েকদিন পর শহরে এক বড় অনুষ্ঠানে অরিন্দমকে ‘শ্রেষ্ঠ সমাজসেবী’ পুরস্কার দেওয়া হলো। মঞ্চে উঠে তিনি বললেন, “মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।”
হঠাৎ দর্শকসারির মাঝখান থেকে রতনের মা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অরিন্দমের বাড়িতে বহুদিন কাজ করেছেন।
কাঁপা গলায় বললেন, “বাবু, মানুষের সামনে দয়া দেখানো সহজ। কিন্তু যে মানুষটি তোমার ঘরের দরজার ভেতরে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তার প্রতি তোমার আচরণই বলে দেয় তুমি আসলে কেমন মানুষ।”
হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অরিন্দমের হাতে ধরা পুরস্কারটি যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। তিনি মাথা নিচু করলেন। এতদিন যে মুখোশ পরে তিনি সমাজের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ সেই মুখোশটাই যেন সবার সামনে খুলে পড়েছে।
সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি প্রথমবার রতনের কাছে ক্ষমা চাইলেন।
রতন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অরিন্দম বললেন, “মানুষকে দেখানোর জন্য ভালো হওয়া নয়, সত্যিই ভালো মানুষ হওয়াটাই আসল। এতদিন আমি শুধু মুখোশ পরে বেঁচেছি।”
বৃদ্ধ মা দূর থেকে মৃদু হাসলেন। শিক্ষা মানুষের আসল পরিচয় তার পোশাক, অর্থ বা লোকদেখানো সুনামে নয়—তার আচরণে। মুখোশ মানুষকে কিছুদিন লুকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরদিন আড়াল করে রাখতে পারে না।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
মুখোশের আড়ালে
-মাধুরী ব্যানার্জী
শহরের ব্যস্ততম মোড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দেখা যেত এক ভদ্রলোককে। পরনে দামি পোশাক, চোখে কালো চশমা, মুখে সবসময় মিষ্টি হাসি। নাম তাঁর অরিন্দম সেন। শহরের সবাই তাঁকে চিনত—দানশীল, ভদ্র, সমাজসেবী মানুষ হিসেবে।
কেউ অসুস্থ হলে সাহায্য করতেন, দরিদ্র ছাত্রদের বই দিতেন, শীতের রাতে কম্বল বিলাতেন। তাঁর প্রশংসায় পত্রিকার পাতাও ভরে উঠত।
কিন্তু অরিন্দমের বাড়িতে কাজ করত রতন নামের এক কিশোর। ছেলেটি সবসময় চুপচাপ থাকত। একদিন ভুল করে একটি দামি ফুলদানি ভেঙে ফেলতেই অরিন্দমের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল।
—“এত বড় ক্ষতি করেছিস! জানিস এর দাম কত?”
রতন কাঁপতে কাঁপতে বলল, “দাদা, ভুল হয়ে গেছে। আমার মাইনে থেকে কেটে নেবেন।”
অরিন্দম কঠিন গলায় বললেন, “তোর মতো লোকের জন্যই বাড়ির সর্বনাশ হয়।”
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলেন অরিন্দমের বৃদ্ধ মা। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মানুষের সামনে যে মুখটা দেখাস, আর ঘরের ভিতর যে মানুষটা হয়ে উঠিস—দুটো কি একই?”
অরিন্দম চুপ করে গেলেন।
কয়েকদিন পর শহরে এক বড় অনুষ্ঠানে অরিন্দমকে ‘শ্রেষ্ঠ সমাজসেবী’ পুরস্কার দেওয়া হলো। মঞ্চে উঠে তিনি বললেন, “মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।”
হঠাৎ দর্শকসারির মাঝখান থেকে রতনের মা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি অরিন্দমের বাড়িতে বহুদিন কাজ করেছেন।
কাঁপা গলায় বললেন, “বাবু, মানুষের সামনে দয়া দেখানো সহজ। কিন্তু যে মানুষটি তোমার ঘরের দরজার ভেতরে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তার প্রতি তোমার আচরণই বলে দেয় তুমি আসলে কেমন মানুষ।”
হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অরিন্দমের হাতে ধরা পুরস্কারটি যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। তিনি মাথা নিচু করলেন। এতদিন যে মুখোশ পরে তিনি সমাজের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ সেই মুখোশটাই যেন সবার সামনে খুলে পড়েছে।
সেদিন বাড়ি ফিরে তিনি প্রথমবার রতনের কাছে ক্ষমা চাইলেন।
রতন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অরিন্দম বললেন, “মানুষকে দেখানোর জন্য ভালো হওয়া নয়, সত্যিই ভালো মানুষ হওয়াটাই আসল। এতদিন আমি শুধু মুখোশ পরে বেঁচেছি।”
বৃদ্ধ মা দূর থেকে মৃদু হাসলেন। শিক্ষা মানুষের আসল পরিচয় তার পোশাক, অর্থ বা লোকদেখানো সুনামে নয়—তার আচরণে। মুখোশ মানুষকে কিছুদিন লুকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু সত্যকে চিরদিন আড়াল করে রাখতে পারে না।

আপনার মতামত লিখুন