নদীর ধারে ছোট্ট একটি গ্রাম—শিউলিপুর। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল পুরোনো এক বটগাছ। তার নিচে বসেই প্রতিদিন বিকেলে বাঁশি বাজাত রুদ্র। তার বাঁশির সুরে কখনও ভেসে আসত বর্ষার গন্ধ, কখনও শরতের নীল আকাশ, আবার কখনও যেন হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি।রুদ্রের বাবা ছিলেন গ্রামের বাঁশিওয়ালা। মৃত্যুর আগে তিনি ছেলেকে বলেছিলেন,“বাঁশির সুর শুধু গান নয় রে, মানুষের মনকে কাছে আনার পথ। এমন সুর বাজাবি, যাতে দূরের মানুষও একদিন কাছে আসতে চায়।”বাবার সেই কথা রুদ্র মনে রেখেছিল।কিন্তু শিউলিপুরে তখন অদ্ভুত এক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। নদীর ওপারের গ্রামের সঙ্গে বহুদিনের জমিজমা নিয়ে বিবাদ। এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলত না। উৎসব বন্ধ, যাতায়াত বন্ধ—এমনকি নদীর ঘাটটিও যেন দুই গ্রামের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।একদিন সন্ধ্যায় রুদ্র বটগাছের নিচে বসে বাঁশি ধরল। সেদিন সে এমন একটি সুর তুলল, যা আগে কখনও বাজায়নি।সুরটি ধীরে ধীরে নদীর ওপারে পৌঁছাল।ওপারের গ্রামের এক বৃদ্ধ থমকে দাঁড়ালেন। বহু বছর আগে তাঁর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সুরের মধ্যে তিনি যেন শুনতে পেলেন হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের ডাক।পরদিন তিনি নৌকা নিয়ে নদী পার হলেন।এদিকে শিউলিপুরের কয়েকজন মানুষও ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে কেউ কথা বলল না। তারপর বৃদ্ধটি ধীরে ধীরে বললেন,“জমির সীমানা নিয়ে আমরা এতদিন লড়েছি, কিন্তু মানুষের সম্পর্কের সীমানা কে টেনেছিল?”কথাটি যেন সবার বুকের দরজা খুলে দিল।দু-গ্রামের প্রবীণরা বসে কথা বললেন। পুরোনো ভুল বোঝাবুঝির অনেকটাই মিটে গেল। যে ঘাট এতদিন বিচ্ছেদের প্রতীক ছিল, সেখানেই শুরু হলো নতুন করে যাতায়াত।সেদিন সন্ধ্যায় আবার রুদ্র বাঁশি বাজাল।নদীর দুই পারে একসঙ্গে জ্বলে উঠল প্রদীপ।রুদ্রের মনে হলো, তার বাবার কথার সত্যিকারের অর্থ আজ সে বুঝতে পেরেছে—সুরের কাজ শুধু কান ভরানো নয়, হৃদয়ের বন্ধ দরজায় আলতো করে কড়া নাড়া।তার বাঁশির সুর নদীর ওপর দিয়ে ভেসে চলল।সে সুরের নাম হয়ে গেল—মিলন বাঁশির সুর।