বাড়িটা আজ আলোয় ঝলমল করছে। উঠোনজুড়ে রঙিন আলপনা, দরজায় ফুলের মালা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা পদের সুগন্ধ। বহু বছর পর বড় করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন অমলবাবু।
সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। কে কোথায় বসবে, কে কখন খাবে—সবকিছুর হিসেব যেন নিখুঁত।
হঠাৎ দুপুরের দিকে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।
পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ চোখে অদ্ভুত এক মায়া।
দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, —“কাকে চান?”
বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, —“অমলকে একবার ডাকবে বাবা?”
দারোয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, —“আপনার নিমন্ত্রণপত্র আছে?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
—“না, নেই।”
—“তাহলে ভেতরে যাওয়া যাবে না।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, —“ঠিক আছে। শুধু বলো, রঘু এসেছে।”
নামটা শুনে দারোয়ান ভেতরে খবর দিল।
অমলবাবু ছুটে এলেন।
গেটের কাছে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।
—“রঘুদা!”
পরক্ষণেই ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের পা জড়িয়ে ধরলেন।
চারপাশের লোকজন অবাক।
রঘুদা অমলকে তুলে নিয়ে বললেন, —“কী রে, এত বড় হয়ে গেছিস! চিনতেই পারলাম না।”
অমলের চোখে তখন জল।
“রঘুদা” ছিলেন তাঁদের গ্রামের পুরোনো চায়ের দোকানের মালিক। অমলের বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব নেমে এসেছিল। স্কুলের ফি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সেই সময় রঘুদাই নিজের দোকানের সামান্য আয় থেকে অমলের পড়াশোনার খরচ দিতেন।
অমল একদিন শহরে চাকরি পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
তারপর জীবন এগিয়েছে। বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, সম্মান হয়েছে—কিন্তু সেই ব্যস্ত জীবনে রঘুদার কথা কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
বিয়ের নিমন্ত্রণের তালিকায়ও তাঁর নাম ওঠেনি।
রঘুদা বললেন, —“তোর মেয়ের বিয়ে শুনে চলে এলাম। ভাবলাম, নিজের ছেলের মেয়ের বিয়েতে কি আর নিমন্ত্রণ লাগে?”
অমল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবাইকে বললেন,
—“আজকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এসেছেন নিমন্ত্রণ ছাড়াই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই মানুষটির ঋণ শোধ করার মতো কোনো নিমন্ত্রণপত্র পৃথিবীতে ছাপা হয়নি।”
সবাই নীরব।
অমল রঘুদার হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে গেলেন।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে রঘুদা বললেন, —“সুখী হোস মা। তোর বাবাকে মানুষ হতে দেখেছি। আজ তার মেয়েকে নতুন জীবনে পা দিতে দেখে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের কষ্টগুলো সার্থক হয়েছে।”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।
অমল তাঁর হাত শক্ত করে ধরে বললেন, —“রঘুদা, আজ থেকে আপনি আমার বাড়ির অতিথি নন। আপনি এই বাড়ির একজন মানুষ।”
রঘুদা মৃদু হেসে বললেন, —“তাহলে আজ থেকে আর নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করতে হবে না তো?”
অমলের চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
—“না রঘুদা। কিছু মানুষকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না। তারা নিজেরাই আমাদের জীবনের দরজায় এসে মনে করিয়ে দেয়—কৃতজ্ঞতার কোনো ঠিকানা নেই, কোনো নিমন্ত্রণপত্রও নেই।”
সেদিন বিয়ের ভোজে সবচেয়ে সম্মানের আসনটি ছিল সেই নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথির জন্য।

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাড়িটা আজ আলোয় ঝলমল করছে। উঠোনজুড়ে রঙিন আলপনা, দরজায় ফুলের মালা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা পদের সুগন্ধ। বহু বছর পর বড় করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন অমলবাবু।
সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। কে কোথায় বসবে, কে কখন খাবে—সবকিছুর হিসেব যেন নিখুঁত।
হঠাৎ দুপুরের দিকে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।
পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ চোখে অদ্ভুত এক মায়া।
দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, —“কাকে চান?”
বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, —“অমলকে একবার ডাকবে বাবা?”
দারোয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, —“আপনার নিমন্ত্রণপত্র আছে?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
—“না, নেই।”
—“তাহলে ভেতরে যাওয়া যাবে না।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, —“ঠিক আছে। শুধু বলো, রঘু এসেছে।”
নামটা শুনে দারোয়ান ভেতরে খবর দিল।
অমলবাবু ছুটে এলেন।
গেটের কাছে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।
—“রঘুদা!”
পরক্ষণেই ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের পা জড়িয়ে ধরলেন।
চারপাশের লোকজন অবাক।
রঘুদা অমলকে তুলে নিয়ে বললেন, —“কী রে, এত বড় হয়ে গেছিস! চিনতেই পারলাম না।”
অমলের চোখে তখন জল।
“রঘুদা” ছিলেন তাঁদের গ্রামের পুরোনো চায়ের দোকানের মালিক। অমলের বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব নেমে এসেছিল। স্কুলের ফি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সেই সময় রঘুদাই নিজের দোকানের সামান্য আয় থেকে অমলের পড়াশোনার খরচ দিতেন।
অমল একদিন শহরে চাকরি পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
তারপর জীবন এগিয়েছে। বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, সম্মান হয়েছে—কিন্তু সেই ব্যস্ত জীবনে রঘুদার কথা কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল।
বিয়ের নিমন্ত্রণের তালিকায়ও তাঁর নাম ওঠেনি।
রঘুদা বললেন, —“তোর মেয়ের বিয়ে শুনে চলে এলাম। ভাবলাম, নিজের ছেলের মেয়ের বিয়েতে কি আর নিমন্ত্রণ লাগে?”
অমল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবাইকে বললেন,
—“আজকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এসেছেন নিমন্ত্রণ ছাড়াই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই মানুষটির ঋণ শোধ করার মতো কোনো নিমন্ত্রণপত্র পৃথিবীতে ছাপা হয়নি।”
সবাই নীরব।
অমল রঘুদার হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে গেলেন।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে রঘুদা বললেন, —“সুখী হোস মা। তোর বাবাকে মানুষ হতে দেখেছি। আজ তার মেয়েকে নতুন জীবনে পা দিতে দেখে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের কষ্টগুলো সার্থক হয়েছে।”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।
অমল তাঁর হাত শক্ত করে ধরে বললেন, —“রঘুদা, আজ থেকে আপনি আমার বাড়ির অতিথি নন। আপনি এই বাড়ির একজন মানুষ।”
রঘুদা মৃদু হেসে বললেন, —“তাহলে আজ থেকে আর নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করতে হবে না তো?”
অমলের চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
—“না রঘুদা। কিছু মানুষকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না। তারা নিজেরাই আমাদের জীবনের দরজায় এসে মনে করিয়ে দেয়—কৃতজ্ঞতার কোনো ঠিকানা নেই, কোনো নিমন্ত্রণপত্রও নেই।”
সেদিন বিয়ের ভোজে সবচেয়ে সম্মানের আসনটি ছিল সেই নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথির জন্য।

আপনার মতামত লিখুন