দৈনিক আলোকিত সলঙ্গা

সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, ঔপন্যাসিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প: নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি -মাধুরী ব্যানার্জী



সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, ঔপন্যাসিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প: নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি -মাধুরী ব্যানার্জী
সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, ঔপন্যাসিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প: নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি -মাধুরী ব্যানার্জী

বাড়িটা আজ আলোয় ঝলমল করছে। উঠোনজুড়ে রঙিন আলপনা, দরজায় ফুলের মালা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা পদের সুগন্ধ। বহু বছর পর বড় করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন অমলবাবু।

সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। কে কোথায় বসবে, কে কখন খাবে—সবকিছুর হিসেব যেন নিখুঁত।

হঠাৎ দুপুরের দিকে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।

পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ চোখে অদ্ভুত এক মায়া।

দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, —“কাকে চান?”

বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, —“অমলকে একবার ডাকবে বাবা?”

দারোয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, —“আপনার নিমন্ত্রণপত্র আছে?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

—“না, নেই।”

—“তাহলে ভেতরে যাওয়া যাবে না।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, —“ঠিক আছে। শুধু বলো, রঘু এসেছে।”

নামটা শুনে দারোয়ান ভেতরে খবর দিল।

অমলবাবু ছুটে এলেন।

গেটের কাছে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।

—“রঘুদা!”

পরক্ষণেই ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের পা জড়িয়ে ধরলেন।

চারপাশের লোকজন অবাক।

রঘুদা অমলকে তুলে নিয়ে বললেন, —“কী রে, এত বড় হয়ে গেছিস! চিনতেই পারলাম না।”

অমলের চোখে তখন জল।

“রঘুদা” ছিলেন তাঁদের গ্রামের পুরোনো চায়ের দোকানের মালিক। অমলের বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব নেমে এসেছিল। স্কুলের ফি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সেই সময় রঘুদাই নিজের দোকানের সামান্য আয় থেকে অমলের পড়াশোনার খরচ দিতেন।

অমল একদিন শহরে চাকরি পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।

তারপর জীবন এগিয়েছে। বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, সম্মান হয়েছে—কিন্তু সেই ব্যস্ত জীবনে রঘুদার কথা কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

বিয়ের নিমন্ত্রণের তালিকায়ও তাঁর নাম ওঠেনি।

রঘুদা বললেন, —“তোর মেয়ের বিয়ে শুনে চলে এলাম। ভাবলাম, নিজের ছেলের মেয়ের বিয়েতে কি আর নিমন্ত্রণ লাগে?”

অমল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবাইকে বললেন,

—“আজকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এসেছেন নিমন্ত্রণ ছাড়াই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই মানুষটির ঋণ শোধ করার মতো কোনো নিমন্ত্রণপত্র পৃথিবীতে ছাপা হয়নি।”

সবাই নীরব।

অমল রঘুদার হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে গেলেন।

মেয়ের মাথায় হাত রেখে রঘুদা বললেন, —“সুখী হোস মা। তোর বাবাকে মানুষ হতে দেখেছি। আজ তার মেয়েকে নতুন জীবনে পা দিতে দেখে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের কষ্টগুলো সার্থক হয়েছে।”

কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।

অমল তাঁর হাত শক্ত করে ধরে বললেন, —“রঘুদা, আজ থেকে আপনি আমার বাড়ির অতিথি নন। আপনি এই বাড়ির একজন মানুষ।”

রঘুদা মৃদু হেসে বললেন, —“তাহলে আজ থেকে আর নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করতে হবে না তো?”

অমলের চোখ বেয়ে জল নেমে এল।

—“না রঘুদা। কিছু মানুষকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না। তারা নিজেরাই আমাদের জীবনের দরজায় এসে মনে করিয়ে দেয়—কৃতজ্ঞতার কোনো ঠিকানা নেই, কোনো নিমন্ত্রণপত্রও নেই।”

সেদিন বিয়ের ভোজে সবচেয়ে সম্মানের আসনটি ছিল সেই নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথির জন্য।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক আলোকিত সলঙ্গা

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, ঔপন্যাসিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প: নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথি -মাধুরী ব্যানার্জী

প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাড়িটা আজ আলোয় ঝলমল করছে। উঠোনজুড়ে রঙিন আলপনা, দরজায় ফুলের মালা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা পদের সুগন্ধ। বহু বছর পর বড় করে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন অমলবাবু।

সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। কে কোথায় বসবে, কে কখন খাবে—সবকিছুর হিসেব যেন নিখুঁত।

হঠাৎ দুপুরের দিকে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ।

পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, অথচ চোখে অদ্ভুত এক মায়া।

দারোয়ান এগিয়ে এসে বলল, —“কাকে চান?”

বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, —“অমলকে একবার ডাকবে বাবা?”

দারোয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, —“আপনার নিমন্ত্রণপত্র আছে?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।

—“না, নেই।”

—“তাহলে ভেতরে যাওয়া যাবে না।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, —“ঠিক আছে। শুধু বলো, রঘু এসেছে।”

নামটা শুনে দারোয়ান ভেতরে খবর দিল।

অমলবাবু ছুটে এলেন।

গেটের কাছে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।

—“রঘুদা!”

পরক্ষণেই ছুটে গিয়ে বৃদ্ধের পা জড়িয়ে ধরলেন।

চারপাশের লোকজন অবাক।

রঘুদা অমলকে তুলে নিয়ে বললেন, —“কী রে, এত বড় হয়ে গেছিস! চিনতেই পারলাম না।”

অমলের চোখে তখন জল।

“রঘুদা” ছিলেন তাঁদের গ্রামের পুরোনো চায়ের দোকানের মালিক। অমলের বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারে অভাব নেমে এসেছিল। স্কুলের ফি দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। সেই সময় রঘুদাই নিজের দোকানের সামান্য আয় থেকে অমলের পড়াশোনার খরচ দিতেন।

অমল একদিন শহরে চাকরি পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।

তারপর জীবন এগিয়েছে। বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, সম্মান হয়েছে—কিন্তু সেই ব্যস্ত জীবনে রঘুদার কথা কোথাও যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

বিয়ের নিমন্ত্রণের তালিকায়ও তাঁর নাম ওঠেনি।

রঘুদা বললেন, —“তোর মেয়ের বিয়ে শুনে চলে এলাম। ভাবলাম, নিজের ছেলের মেয়ের বিয়েতে কি আর নিমন্ত্রণ লাগে?”

অমল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সবাইকে বললেন,

—“আজকের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এসেছেন নিমন্ত্রণ ছাড়াই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই মানুষটির ঋণ শোধ করার মতো কোনো নিমন্ত্রণপত্র পৃথিবীতে ছাপা হয়নি।”

সবাই নীরব।

অমল রঘুদার হাত ধরে মঞ্চে নিয়ে গেলেন।

মেয়ের মাথায় হাত রেখে রঘুদা বললেন, —“সুখী হোস মা। তোর বাবাকে মানুষ হতে দেখেছি। আজ তার মেয়েকে নতুন জীবনে পা দিতে দেখে মনে হচ্ছে, আমার জীবনের কষ্টগুলো সার্থক হয়েছে।”

কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।

অমল তাঁর হাত শক্ত করে ধরে বললেন, —“রঘুদা, আজ থেকে আপনি আমার বাড়ির অতিথি নন। আপনি এই বাড়ির একজন মানুষ।”

রঘুদা মৃদু হেসে বললেন, —“তাহলে আজ থেকে আর নিমন্ত্রণের অপেক্ষা করতে হবে না তো?”

অমলের চোখ বেয়ে জল নেমে এল।

—“না রঘুদা। কিছু মানুষকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না। তারা নিজেরাই আমাদের জীবনের দরজায় এসে মনে করিয়ে দেয়—কৃতজ্ঞতার কোনো ঠিকানা নেই, কোনো নিমন্ত্রণপত্রও নেই।”

সেদিন বিয়ের ভোজে সবচেয়ে সম্মানের আসনটি ছিল সেই নিমন্ত্রণ বিহীন অতিথির জন্য।


দৈনিক আলোকিত সলঙ্গা

প্রধান উপদেষ্টা :
খান সেলিম রহমান (প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব, সম্পাদক জাতীয় দৈনিক মাতৃজগত পত্রিকা
উপদেষ্টাঃ
আওরঙ্গজেব কামাল- (সভাপতি ঢাকা প্রেসক্লাব)
উপদেষ্টা: মোঃ মাহিদুল হাসান সরকার (সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব
উপদেষ্টা: শেখ মোঃ হুমায়ুন কবির (দপ্তর সম্পাদক বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব)
উপদেষ্টা: এম দুলাল উদ্দিন আহমেদ (সাধারণ সম্পাদক সলঙ্গা প্রেসক্লাব)
উপদেষ্টা: মোঃ জাকির হোসেন (সাধারণ সম্পাদক হাটিকুমরুল প্রেসক্লাব)
উপদেষ্টা: মোঃ মিজানুর রহমান মিজান (সাংগঠনিক সম্পাদক সলঙ্গা প্রেসক্লাব)
নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ সাইদুল ইসলাম আবির সম্পাদক খোলা বার্তা
বার্তা সম্পাদক: লাবনী খাতুন
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ লুৎফর রহমান লিটন স্টাফ রিপোর্টার: "জাতীয় দৈনিক মাতৃজগত প্রত্রিকা কার্যনির্বাহী সদস্য বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব

চেয়ারম্যানঃ মোঃ লুৎফর রহমান লিটন Email: dailyalokitosolanga@gmail.com মোবাইল: ০১৭৫৯০০৩৩৫৮ কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক আলোকিত সলঙ্গা
.