প্রকৃতিতে শরৎ বিদায় নিয়ে জানান দিচ্ছে হেমন্তের আগমনী বার্তা। ভোরের হালকা শীত আর ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরে ধীরে ধীরে অনুভূত হচ্ছে শীতের ছোঁয়া। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজে এখন ব্যস্ত তাঁরা। আর মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন পর গাছে হাঁড়ি বসিয়ে রস সংগ্রহ শুরু হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে, রেললাইনের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, পুকুরপাড়ে ও রাস্তার ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য খেজুরগাছ। শীত মৌসুমে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন গাছিরা। তাই মৌসুমের শুরুতেই গাছগুলোকে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে চলছে পরিচর্যা ও ঝোড়ার কাজ।
স্থানীয়ভাবে খেজুরগাছের মাথার নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করার প্রক্রিয়াকে ‘গাছ ঝোড়া’ বলা হয়। এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই মূলত গাছি হিসেবে পরিচিত। গাছ ঝোড়ার পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করে গাছে হাঁড়ি বসানো হয়। এরপর রাতভর গাছ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস জমতে থাকে মাটির হাঁড়িতে। সকালে সেই হাঁড়ি নামিয়ে সংগ্রহ করা হয় সুস্বাদু খেজুরের রস।
হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—এই তিন ঋতুতে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। তবে শীতের সময় রসের চাহিদা ও ব্যবহার বেশি দেখা যায়। খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু তরল গুড় ও পাটালি। এ ছাড়া খেজুরের রস দিয়ে পায়েস, পিঠা-পুলি এবং নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হয়। শীতের সকালে টাটকা খেজুরের রস পান করার জন্যও অপেক্ষায় থাকেন অনেকেই।
রস সংগ্রহ শুরু হলে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে খেজুরের গুড়ের বেচাকেনা জমে ওঠে। উপজেলার আহসানগঞ্জ, ক্যাশাবাড়ি, নন্দলী বাজার, মির্জাপুর, সুটকিগাছা ও বান্দাইখাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে খেজুরের পাটালি ও তরল গুড়ের চাহিদা থাকে। পাশাপাশি বড়শিমলা ও আশপাশের এলাকার বাজারগুলোতেও মৌসুমে এসব পণ্যের কেনাবেচা বাড়ে। এতে স্থানীয়ভাবে মৌসুমি ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গতি আসে।
খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজে ব্যস্ত গাছিরা এখন রস সংগ্রহের মৌসুম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন। গাছ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে হাঁড়ি বসানো, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির প্রতিটি ধাপেই রয়েছে তাঁদের শ্রম ও অভিজ্ঞতা। মৌসুম ভালো হলে রস ও গুড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করার সুযোগ তৈরি হয় তাঁদের।
আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, তাঁর ১০টি খেজুরগাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ ঝোড়ার জন্য গাছিকে ১৪০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে। বর্তমানে পুরোদমে চলছে খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজ। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই গাছগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে সময়মতো রস সংগ্রহ করা যায়।
গ্রামবাংলার শীতকালীন ঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় গ্রামীণ জনপদের বহু বাড়িতে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির দৃশ্য ছিল পরিচিত। এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন আত্রাইয়ের গাছিরা। তাঁদের পরিশ্রমে শীতের সকালে যেমন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তাজা রস, তেমনি তৈরি হয় পিঠা-পুলি ও পায়েসের মতো নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
প্রকৃতিতে শীতের আমেজ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্রাইয়ের গ্রামগুলোতে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ব্যস্ততা বাড়বে। গাছ ঝোড়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখন অপেক্ষা, কবে ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে নামানো হবে টাটকা খেজুরের রস আর স্থানীয় হাট-বাজারে জমে উঠবে শীতের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের বেচাকেনা।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকৃতিতে শরৎ বিদায় নিয়ে জানান দিচ্ছে হেমন্তের আগমনী বার্তা। ভোরের হালকা শীত আর ঘাসের ওপর জমে থাকা শিশিরে ধীরে ধীরে অনুভূত হচ্ছে শীতের ছোঁয়া। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজে এখন ব্যস্ত তাঁরা। আর মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন পর গাছে হাঁড়ি বসিয়ে রস সংগ্রহ শুরু হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে, রেললাইনের পাশে, বাড়ির আঙিনায়, পুকুরপাড়ে ও রাস্তার ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য খেজুরগাছ। শীত মৌসুমে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন গাছিরা। তাই মৌসুমের শুরুতেই গাছগুলোকে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে চলছে পরিচর্যা ও ঝোড়ার কাজ।
স্থানীয়ভাবে খেজুরগাছের মাথার নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করার প্রক্রিয়াকে ‘গাছ ঝোড়া’ বলা হয়। এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই মূলত গাছি হিসেবে পরিচিত। গাছ ঝোড়ার পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করে গাছে হাঁড়ি বসানো হয়। এরপর রাতভর গাছ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রস জমতে থাকে মাটির হাঁড়িতে। সকালে সেই হাঁড়ি নামিয়ে সংগ্রহ করা হয় সুস্বাদু খেজুরের রস।
হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—এই তিন ঋতুতে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। তবে শীতের সময় রসের চাহিদা ও ব্যবহার বেশি দেখা যায়। খেজুরের রস থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু তরল গুড় ও পাটালি। এ ছাড়া খেজুরের রস দিয়ে পায়েস, পিঠা-পুলি এবং নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করা হয়। শীতের সকালে টাটকা খেজুরের রস পান করার জন্যও অপেক্ষায় থাকেন অনেকেই।
রস সংগ্রহ শুরু হলে আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে খেজুরের গুড়ের বেচাকেনা জমে ওঠে। উপজেলার আহসানগঞ্জ, ক্যাশাবাড়ি, নন্দলী বাজার, মির্জাপুর, সুটকিগাছা ও বান্দাইখাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে খেজুরের পাটালি ও তরল গুড়ের চাহিদা থাকে। পাশাপাশি বড়শিমলা ও আশপাশের এলাকার বাজারগুলোতেও মৌসুমে এসব পণ্যের কেনাবেচা বাড়ে। এতে স্থানীয়ভাবে মৌসুমি ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গতি আসে।
খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজে ব্যস্ত গাছিরা এখন রস সংগ্রহের মৌসুম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন। গাছ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে হাঁড়ি বসানো, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির প্রতিটি ধাপেই রয়েছে তাঁদের শ্রম ও অভিজ্ঞতা। মৌসুম ভালো হলে রস ও গুড় বিক্রি করে বাড়তি আয় করার সুযোগ তৈরি হয় তাঁদের।
আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, তাঁর ১০টি খেজুরগাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ ঝোড়ার জন্য গাছিকে ১৪০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়েছে। বর্তমানে পুরোদমে চলছে খেজুরগাছ ঝোড়ার কাজ। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই গাছগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে সময়মতো রস সংগ্রহ করা যায়।
গ্রামবাংলার শীতকালীন ঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রস ও গুড়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। একসময় গ্রামীণ জনপদের বহু বাড়িতে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির দৃশ্য ছিল পরিচিত। এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন আত্রাইয়ের গাছিরা। তাঁদের পরিশ্রমে শীতের সকালে যেমন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তাজা রস, তেমনি তৈরি হয় পিঠা-পুলি ও পায়েসের মতো নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার।
প্রকৃতিতে শীতের আমেজ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্রাইয়ের গ্রামগুলোতে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ব্যস্ততা বাড়বে। গাছ ঝোড়ার মধ্য দিয়ে সেই প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এখন অপেক্ষা, কবে ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে নামানো হবে টাটকা খেজুরের রস আর স্থানীয় হাট-বাজারে জমে উঠবে শীতের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের বেচাকেনা।

আপনার মতামত লিখুন